
বাংলাদেশের জনপরিসরে রাজনীতির কেন্দ্রীয় মাঠটা যেহেতু কালচার, তাই ন্যারেটিভ ও ইমেজের খেলায় চারুকলার একটা উল্লেখযোগ্য রোল আছে বরাবরই। মঙ্গল/আনন্দ/বৈশাখি শোভাযাত্রা তারই ক্রিস্টালাইজেশন।
প্রতিবছর বৈশাখকে কেন্দ্র করে এই উৎসব সারা দেশের মানুষের মনোযোগ যেই পরিমাণ দখল করে রাখতে সক্ষম, তা আওয়ামী লীগ একচেটিয়াভাবে নিজের কবজায় রাখতে চাইছিল, সক্ষমও হইছিল। বিএনপির এক্সেস না থাকলেও, সে কোনোদিন ক্ষমতায় আসবে এবং এক্সেস পাবে—এই সম্ভাবনা যেহেতু ছিল, তাকে বৈশাখের সরাসরি বিরোধিতা করতে হয়নি। কিন্তু জামাত ও ইসলামিস্ট দলগুলো বিশ্বাস করে যে, তারা এই বিশাল মনোযোগ আকর্ষণের হাতিয়ারের এক্সেস কোনোদিনই নিতে পারবে না, মডিফাইও করতে পারবে না। বরঞ্চ, জন-মনোযোগ দখলের জন্য তাদের নিজেদের যেসব ইন্সট্রুমেন্ট বিদ্যমান, সেগুলার সাথে বৈশাখের কাড়াকাড়ি আছে। ফলে তাদের জন্য এই উৎসবকে বাতিল করতে চাওয়াটাই যৌক্তিক মনে হইছে। ধর্ম এখানে আসলে একটা উছিলা মাত্র। লীগের জন্য যদি বৈশাখ লসজনক হইতো, তবে সে যেমন কোনো না কোনোভাবে এর মাঝে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমাননা’ খুঁজে পাইতো, তেমনি জামাত-হেফাজতও এখানে ব্যবসা ও রাজনীতির লস দেখছে বলেই একে ধর্মের সাথে কনফ্লিক্ট হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। ফলে, এই দখল-পাল্টা দখলের লড়াইটাকে ধর্ম বনাম সেকুলারিজমের বাইরে থেকেও দেখার দরকার আছে। বৈশাখ কার গোআতে কতটুকু আঙুল দিয়ে রাখছে, তার হদিস না করে শুধু অধিকারের আলাপ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবার নয়।
একইসাথে দরকার আছে চারুকলার শিল্পীদেরও কিছু আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধিকরণ। শুধু আবেগ দিয়ে মেধা ও পরিশ্রমের ঘাটতি পূরণ আর কতদিন? “আমি আর্টিস্ট, এক বিপন্নপ্রায় প্রাণী, আমাকে অভয়ারণ্য দাও”—এইসব নাকি কান্না করে তো চলবে না। নিজের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালনের ভেতর দিয়েই নিজেদের অপরিহার্য গুরুত্ব তৈরি করতে হয়। একটা রাষ্ট্র হতে হলে তার এমন কিছু ছবি লাগে যা তার স্বকীয়তা ও ঐতিহ্যকে এমনভাবে তুলে ধরবে যেন সেই ছবিগুলোর ভেতর রাষ্ট্রের সবাই নিজেদের দেখতে পায়। এই ছবিগুলো বানানো কার দায়িত্ব? চারুকলার। তা কি সে বানাইছে? সর্বজনীন বলে যা যা সে হাজির করে তার ভেতর তো এক্সক্লুশন আছেই।
দায়িত্ব বাদ দিয়া চলতেছে শুধু প্রতিক্রিয়াশীলতা আর পোলারাইজেশন। মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমরা কী এক মৌলবাদী যুদ্ধ লাগায়ে রাখছি!
বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট শক্তির যে তাণ্ডব, তাকে মোকাবিলা করতেই হবে। বৈশাখ সেই লড়াইয়ের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে শুধু প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করে যে সেটা সম্ভব না, সেই রিয়ালাইজেশনটা চারুকলা সমাজের আসা জরুরি। চারুকলা যে বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি নির্মাণে গাফিলতি করছে, সেটা অনুভব করা লাগবে। সকল পরিচয়ের মানুষ (এমনকি মুসলমানও) যেন এই ছবির মাঝে নিজেদের খুঁজে পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এবং সেই উপস্থাপনটা স্থূল হলে চলবে না। যেমনটা গত বছর ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করতে যেয়ে শেখ হাসিনার ‘কালো, নাকবোঁচা, গরুর শিংওয়ালা ডাইনি’ ইমেজের মতো একটা রেসিস্ট ইমেজ তৈরি করার মাধ্যমে হইছিল।

Leave a Reply